রাত গভীর হয়ে আসছে, কিন্তু আমার ঘুম আসছে না।
ফোনের ওপাশ থেকে একটা মিষ্টি কণ্ঠ, আহ্লাদী স্বরে বলে উঠল—
— “আমার ঘুম আসছে না!”
— “ঘুম আসে না মানে? না ঘুমালে ঘুম আসবে কীভাবে?”
— “জানি না, আমার ঘুম আসছে না!”
— “আচ্ছা, আমি কী করি বলো?”
— “আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও…”
আমি হেসে বললাম—
— “ফোনে ঘুম পাড়াবো কীভাবে? আম্মুকে ডাকো, উনি ঘুম পাড়িয়ে দেবেন!”
— “উহু, আম্মুকে বললে অনেক বকা দেবে। তুমি দাও না!”
এই মেয়েকে নিয়ে আমি একেবারে বিপদে আছি। প্রেমের সেই প্রথম উত্তেজনাটা এখন যেন এক মিষ্টি যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।
আমি রোমন, আর যার সঙ্গে কথা বলছি, সে আমার হবু স্ত্রী— নওরিন জাহান নীরা।
আমাদের বিয়েটা আগেই হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নীরার শর্ত— “আগে পড়া শেষ করব, তারপর রান্নাবান্না শিখব, তারপর সংসার সামলানোর ট্রেনিং নেব, তারপর বিয়ে!”
আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম—
— “সংসার সামলানোর কোর্স আবার কী?”
— “আরে মশাই! রান্নাবান্না! এখন যদি ভালো না বানাতে পারি, পরে তুমি আমাকে খুন করতে চাইবে, ভালোবাসবে না!”
তার হাসিটা আমাকে পাগল করে তোলে। মনে মনে বললাম—
“এই হাসিটা যদি বিয়ের পরও থাকে, তাহলে এক ফোঁটাও ভালোবাসা কমবে না!”
আমাদের বিয়ে পেছানো হলো চার মাসের জন্য। আর এই চার মাসেই নীরা যেন আমার অস্তিত্বের অংশ হয়ে উঠল।
— “কি হলো, কোথায় হারিয়ে গেলে? ভয়ানক ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু আসছে না!”
— “আচ্ছা, ভেবে নাও আমি তোমার সামনে আছি, তুমি আমাকে দেখছো। দেখবে, দেখতে দেখতেই ঘুম চলে আসবে!”
— “কি আজব! তুমি সামনে থাকলে আমি ঘুমাবো নাকি?”
— “তাহলে কী করবে?”
— “যাই করি না কেনো, আমার ব্যাপার! আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও না প্লিজ…”
— “আচ্ছা, ধরে নাও তুমি আমার বুকে শুয়ে আছো। এভাবে ভাবলে ঘুম চলে আসবে!”
— “আচ্ছা…!”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
— “এই শুনছো? গালে একটু আদর করে দাও না!”
— “হুম দিলাম!”
— “না এভাবে না, ঠান্ডা হাতটা রাখো না আমার গালে!”
— “আচ্ছা!”
কথা বলতে বলতে নীরা ঘুমিয়ে পড়ল। আমি ফোনটা কেটে ঠোঁটের কোণে একটা হাসি নিয়ে শুয়ে পড়লাম।
নীরার ক্যাম্পাসে ওর বান্ধবীরা আমাকে দেখতে চায়। বড় মাপের দাওয়াত। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গেলাম।
ক্যান্টিনে ঢুকে দেখি, ওর বান্ধবীরা নীরাকে ঘিরে আছে। আমাকে দেখেই সবাই একসঙ্গে—
— “ইউ আর সো হট!”
— “নীরা, ইউ আর সো লাকি!”
আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেল। এ কী শুরু হলো!
সবাই মজা করছে, কিন্তু নীরা চুপচাপ বসে আছে। কেউ তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। আমি নিজেও না।
হঠাৎ নীরা বলল—
— “এই! আমার জিনিস নিয়ে তোরা এত মাতামাতি করছিস কেনো? আমাকেও যোগ কর!”
একটা মেয়ে মজা করে বলল—
— “ভুলে গেছিস? তোর জামাই হলো আমার জামাই, আর আমার জামাই তোর দুলাভাই! আজ আমরা বদলা নিচ্ছি!”
সবাই হেসে উঠল।
আমি ভাবলাম, একটু মজা করি। নীরার বান্ধবীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কথা বলতে থাকলাম।
একটা মেয়ে আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি সরাইনি।
নীরা কিছুই বলল না। তবে মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝলাম, ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছে!
বিদায় নেওয়ার সময় ও কিছু না বলে রিকশায় উঠে চলে গেল।
আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাসায় ফেরার পর ফোন হাতে নিয়ে বসে আছি। কিন্তু নীরার কোনো ফোন নেই।
রাত এগারোটায় হবু শাশুড়ির ফোন—
— “বাবা, তুমি একটু এসো, নীরা দুপুর থেকে কিছু খায়নি। রুমের দরজা বন্ধ করে বসে আছে!”
আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম।
বাড়িতে পৌঁছে শুনলাম, নীরা দুপুর থেকে রেগে আছে। গ্লাস ভেঙেছে, রুমে ঢুকতে দিচ্ছে না।
আমি দরজার কাছে গিয়ে ডাকলাম—
— “নীরা, দরজা খোলো, প্লিজ!”
— “আমি এই নামের কাউকে চিনি না! আমাকে একা থাকতে দাও!”
আমি ধৈর্য ধরে বললাম—
— “দেখো, তুমি দরজা না খুললে আমিও কিছু খাবো না!”
অবশেষে দরজা খুলল। চোখ লাল হয়ে গেছে।
— “দেখো, আমি তোমার সঙ্গে মজা করছিলাম, কিন্তু আমি ওদের পাত্তা দিইনি!”
— “কিন্তু ওরা বলেছে, তুমি ওদের সঙ্গে ফ্লার্ট করছিলে!”
আমি নীরার হাত ধরে বললাম—
— “তোমার হাতটা আমার হাতে নিয়েছি অনেক ভরসা করে। তুমি কি বিশ্বাস করো না, আমি শুধু তোমার?”
নীরা কিছু বলল না, শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম—
— “ঠিক আছে, যদি তুমি বিশ্বাস না করো, তাহলে ভালো থেকো, বাই নীরা!”
আমি পা বাড়াতেই পেছন থেকে একটা গলা—
— “রোমন, থামো!”
ঘুরে দেখি, নীরা ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
— “প্লিজ, আমাকে যত তাড়াতাড়ি পারো বিয়ে করো! আমি আর এসব সহ্য করতে পারবো না। তোমার কাছে অন্য কোনো মেয়েকে আমি দেখতেই পারবো না!”
আমি হাসলাম।
— “এতটুকু বিশ্বাসও নেই?”
নীরা আমার চোখে তাকিয়ে বলল—
— “আমি ভুল করেছি, সরি!”
— “এই সরি বলছো কেনো? দুজনেরই সমান দোষ!”
সেদিনই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নীরাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পুরনো ক্যাম্পাসে গিয়ে মনে হচ্ছিল, যেন সময়টা কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।
ঝালমুড়ি খেতে খেতে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ল। একসময় বন্ধুরা প্রেম করত, আমি খালি তাদের ট্রিট খেতাম।
আর আজ?
আজ আমিই প্রেমে ডুবে আছি।
নীরার হাত শক্ত করে ধরলাম।
— “তোমাকে আমি কোনোদিন হারাতে দেব না!”
নীরা হাসল।
— “তোমার কথাটা লিখে রাখবো! আজীবন মনে করিয়ে দেব!”
আমি হেসে বললাম—
— “আজীবন মনে রাখবে? তাহলে তো আজই বিয়ে করতে হবে!”
নীরা আমার কাঁধে মাথা রাখল।
আমাদের ভালোবাসার নতুন গল্প শুরু হলো…💙✨
সকালবেলা জানালার পর্দা সরিয়ে রোদের আলো ঘরে আসতেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। পাশেই নোটিফিকেশন লাইট জ্বলছিলো, ফোন হাতে নিয়ে দেখি ১৫টা মিসড কল! সবই নীরার। আরেকটু স্ক্রল করতেই দেখতে পেলাম অসংখ্য মেসেজ—
“উঠেছো? আমি অপেক্ষা করছি!”
“তুমি কি রাগ করেই থাকবা?”
“একটা রিপ্লাই দাও প্লিজ! আমার খুব খারাপ লাগছে।”
আমার মুখে অজান্তেই একটা হাসি এলো। মেয়েটা আসলেই আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। কালকের কান্নাকাটির পর ওর অভিমানটা যে পুরোপুরি গলেছে, তা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই একটু দেরি করে রিপ্লাই দিলাম—
“বিয়ে করতে বলছিলে, তাহলে কবে করবো? তোমার ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে কি বউ হওয়া যাবে?”
মিনিট তিনেকের মধ্যে ওর রিপ্লাই—
“আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাবো, কিন্তু এখন তোমার থেকে দূরে থাকতে পারবো না। প্লিজ, রুমন!”
ওর ভালোবাসাটা আমি অনুভব করতে পারছিলাম। নীরা যদি আমার থেকে একদিন দূরে থাকলে এমন অবস্থা হয়, তাহলে আজীবনের জন্য আমি ওকে কাছে পেলে কেমন হবে? ভাবতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠলো।
বিকেলে মা-বাবাকে নিয়ে নীরাদের বাসায় গেলাম। নীরা দরজা খুলতেই প্রথমে একটু কপট রাগ দেখানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু আমার দিকে তাকিয়েই যেন সব ভুলে গেলো। আমাদের দেখে ওর মা একগাল হাসি দিলেন—
“এসো বাবা, তোমার হবু স্ত্রী তোমার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করছে।”
নীরা লজ্জায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমার মা হেসে বললেন—
“তোমরা কবে বিয়ে করবে ঠিক করো, আমরা আর দেরি করবো না।”
এই কথায় নীরা এক ঝটকায় মাথা তুলে তাকালো, চোখে বিস্ময়—
“সত্যি?”
ওর বাবাও সম্মতি জানালেন—
“হ্যাঁ মা, তোমার রাগ, অভিমান, কান্নাকাটি দেখে আমরা বুঝেছি, আর দেরি করা ঠিক হবে না। তোমার পড়াশোনা চলবে, কিন্তু রুমনকে নিয়েই চলবে।”
নীরা আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো, যেন এই মুহূর্তটা ওর কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।
আমাদের বিয়ের দিন ঠিক হলো তিন মাস পর। এর মধ্যে নীরা তার কোর্স শেষ করবে, আর আমি অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করবো।
কিন্তু নীরা বললো—
“তোমাকে একটা চমক দেবো। বিয়ের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করো!”
আমি হেসে বললাম—
“আমি চমক টমক বুঝি না, শুধু তুমি থাকলেই হলো।”
নীরা রহস্যময় হাসি দিলো, কিন্তু কিছু বললো না। আমি ভাবতে লাগলাম, এই মেয়েটা আর কী নতুন সারপ্রাইজ দিতে পারে?
বিয়ের দিন এসে গেলো। সবাই ব্যস্ত, আমি নিজেও এক্সাইটেড! নীরা লাল বেনারসী পরে বসে আছে, আমি তাকিয়েই হাঁ হয়ে গেলাম। অসম্ভব সুন্দর লাগছে ওকে! কিন্তু চমকটা তখনো বাকি ছিল।
নীরা আমার কাছে এসে আস্তে করে বললো—
“একটু ঝুঁকে আসো!”
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম, তারপর ওর কথামতো ঝুঁকলাম। নীরা ধীরে ধীরে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো—
“তোমার জন্য আমার শেষ চমক— আমি তোমার নামেই আমার প্রথম উপন্যাস লিখেছি! নাম দিয়েছি ‘রুমন ও নীরার প্রেমকাহিনী’!”
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। এই মেয়েটা আমাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছে! আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম।
নীরা হাসলো, বললো—
“তোমার কথা তো অনেকবার লিখেছি, এবার সত্যিকারের গল্প শুরু করতে চাই।”
আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না, নীরার হাতটা শক্ত করে ধরলাম। কারণ আমি জানতাম, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পের শুরু… 💖